Biography
Trending

ইমাম গাজ্জালী রহঃ এর জীবনী

ইমাম গাজ্জালী রহঃ এর জীবনী – একাদশ শতাব্দীতে মানুষ অশিক্ষা, কুশিক্ষা, কুফরী, শিরক, বিদআত, কুসংস্কার ও নানাবিধ পাপ কাজে লিপ্ত হতে শুরু করেছিল, অপরদিকে শিক্ষিত যুবসমাজ এরিস্টটল, প্লেটো এবং পাশ্চাত্যের অন্যান্য অমুসলিম দার্শনিকের ভ্রান্ত মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে ইসলামের সত্য পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল,তখন পৃথিবীগে আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হোন মুজাদ্দিদ ইমাম গাজ্জালী (রহ)। তিনি ১০৫৮ সালে ইরানের খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত তুস নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ইমাম গাজ্জালী (রহ) এর প্রকৃত নাম আবু হামেদ মোহাম্মদ গাজ্জালী। কিন্তু তিনি ইমাম গাজ্জালী নামেই খ্যাত। ‘ গাজ্জাল’ শব্দের অর্থ – সুতা কাটা।

এটা তাঁর বংশগত উপাধি। কারো কারো মতে তাঁর পিতা মোহাম্মদ কিংবা পূর্বপুরুষরা সম্ভবত সুতার বানিজ্য করতেন। তাই উপাধি হয়েছে গাজ্জালী।শৈশবেই গাজ্জালী তার পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুতে তিমি নিদারুণ অসহায় অবস্থায় পড়েন কিন্তু মনোবল হারাননি।জ্ঞান লাভের প্রতি তাঁর ছিল খুবই আগ্রহ। তৎকালীন যুগপর বিখ্যাত আলেম হজরত আহমদ ইবনে মুহাম্মদ বারকানি এবং হজরত আবু নাসর ইসমাইলের কাছে তিনি কুরআন,হাদিস, ফিকহ ও বিবিধ বিষয়ে স্বাভাবিক জ্ঞান লাভ করে।

কিন্তু এতে তিনি তৃপ্তবোধ করলেন না। জ্ঞান অন্বেষণের জন্য পাগলের ন্যায় ছুটে যান নিশাপুরের নিযামিয়া মাদ্রাসায়। সে যুগে নিশাপুর ছিল ইসলামি জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য সমৃদ্ধ ও উন্নত। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সর্বপ্রথম ও পৃথিবীর বৃহৎ নিযামিয়া মাদ্রাসা। সেখানে তিনি উক্ত মাদ্রাসার অধ্যক্ষ প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা আবদুল মালিক (রহ)-এর কাছে ইসলামি দর্শন, আইন ও বিবিধ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। আবদুল মালিক (রহ)-এর মৃত্যুর পর তিনি চলে আসেন বাগদাদে।

এখানে এসে তিনি একটি মাদ্রাসার অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং বিভিন্ন জটিল বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। জ্ঞান- বিজ্ঞান ও দর্শনে তাঁর সুখ্যাতি আস্তে আস্তে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য

এবং আল্লাহ সৃষ্টির রহস্যের সন্ধানে ধন-সম্পদ ও ঘর বাড়ির মায়া-মমতা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে এল অজানা পথে। প্রায় দশ বছর দরবেশের বেশে ঘুরে বেড়ান দেশ থেকে দেশান্তরে। আল্লাহর ইবাদত,ধ্যান-মগ্ন,শিক্ষাদান ও জ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে কাটিয়ে দেন দিনরাত।

ইমাম গাজ্জালী রহঃ পরে তিনি জেরুজালেম হয়ে চলে যান মদিনায়। বিশ্বনবীর রওজা মোবারক জিয়ারত শেষে চলে আসেন মক্কায়। এরপর চলে যান আলেকজান্দ্রিয়ায়।সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে আবার ফিরে আসেন মাতৃভূমিতে। ইমাম গাজ্জালী (রহ)-এর আধ্যাত্মিক জ্ঞান ছিল অন্যন্ত গভীর। আল্লাহর স্বরূপ ও সৃষ্টির রহস্য তিনি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর মতে আত্মা ও সৃষ্টির রহস্য এবং আল্লাহর অস্তিত্ব বৈজ্ঞানিক যুক্তি-তর্কে মীমাংসা করার বিষয় নয়, বরং এরূপ চেষ্টা করাও এক প্রকার অন্যায়।

আল্লাহর অস্তিত্ব ও সৃষ্টির রহস্য অনুভূতির বিষয়। পরম সত্য ও অনন্তকে যুক্তি দিয়ে বোঝার কোন অবকাশ নেই। তাঁর মতে যুক্তি দিয়ে আপেক্ষিকতা বোঝা যায় মাত্র। তিনি সকল প্রশ্নের মীমাংসা করেছেন, কুরআন, হাদিস ও তারই ভিত্তিতে নিজের বিবেক-বুদ্ধির সাহায্যে। আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ধর্মের প্রতি তাঁর আস্তা ছিল পর্বতের ন্যায় অটল ও সুদৃঢ়। ধর্ম ও দর্শনে তাঁর ছিল প্রভূত জ্ঞান।

তিনি বলেন, “আত্মা কখনো ধ্বংস হয় না কিন্তু দেহ ধ্বংস হয়। আত্মা মৃত্যুর পর জীবিত থাকে। হৃৎপিণ্ডের সাথে আত্মার কোন সম্পর্ক নেই। হৃৎপিণ্ড একটি মাংসপিণ্ড মাত্র,মৃত্যুর পরেও দেহে এর অস্তিত্ব থাকে। কিন্তু আত্মা মৃত দেহে অবশিষ্ট থাকে না। তিনি ইসলামী জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যে ইসলামের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন। তিনি ছিলেন ধর্ম,আদর্শ ও সুফিবােদর আদর্শ প্রতীক। তিনি বিশ্বাসের ওপর যুক্তিকে প্রাধান্য দিতেন। কিন্তু যা চিরন্তন সত্য ও বাস্তব সেখানে তিনি যুক্তিকে প্রাধান্য দিতেন না বরং সেক্ষেত্রে ভক্তি ও অনুভূতিকেই প্রাধান্য দিতেন।

অঙ্কশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি নক্ষত্রাদির গতি ও প্রকৃতি সম্মন্ধে দুটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তার এ গ্রন্থ দু’টি আজ প্রায় বিলুপ্ত । এছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁ অধিকাংশ গ্রন্থ ত্রয়োদশ এবং চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপে অসাধারণ বিস্তার করে। তাঁর প্রণীত গ্রন্থবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-১. এহইইয়া-উল-উলুমুদ্দিন।  ২. কিমিয়াতে সাদাত। তাঁর সবকটি গ্রন্থ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে বহুল প্রচারিত হয়ে আসছে।

এ মহা মনীষী ইসলামী জ্ঞান- বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এক নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন। তিনি ১১১১ সালে সুস্থ অবস্থায় এ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করে আল্লাহর সানিধ্যে চলে যান। মৃত্যুর দিন ভোরে ঘুম থেকে ওঠে তিনি ফজরের নামাজ আদায় করেন। এরপর নিজ হাতে তৈরি

করা কাফনের কাপড় বের করে বলেন- ” হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। তুমি তো রহমান এবং রাহিম। হে আল্লাহ, একমাত্র তোমাকে পাবার জন্য এবং তোমার স্বরূপ বুঝার জন্যই আমি সকল আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে পথে পথে ঘুরে ফিরেছি বছরের পর বছর এবং একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তরে। তুমি আমাকে ক্ষমা করো “।

এরপর তিনি কাফনের কাপড় পরিধান করে  পা দু-খানা সোজা করে শুয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ যদিও ইমাম গাজ্জালী ইহধামে নেই তবুও তাঁর প্রণীত সুচিন্তিত গ্রন্থ তাকে অনাগতকাল পর্যন্ত আমাদের মাঝে স্বরণীয় করে রাখবে, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।

কমেন্ট করে জানিয়ে দিন – ব্লগ কেমন হলো – যা ইমাম গাজ্জালী রহঃ এর জীবনী – সুলতান রুকনউদ্দীন এর জীবনী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please Disable AdBlocker From Your Browser Setting. So That We can Run Our Website Properly From Our Ads Revenue.